স্টাফ করেসপন্ডেন্ট।।ক্যাপিটালমার্কেট২৪.কম

আগস্ট ২৪, ২০২০

১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ২১ আগস্ট

যারা স্বাধীন বাংলাদেশ মেনে নিতে পারেনি তারাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। একটি জাতির অগ্রযাত্রাকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার সেই ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে এখনও।

স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিদেশে থাকায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। এ যেন শরীরে বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের। তাই সামরিক শাসক জিয়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখেন। এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। তাঁকে বহনকারী বিমান ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। আর সেদিনের দৃশ্যপট জন্ম দিয়েছিল নতুন ষড়যন্ত্রের।

এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন ২৪ জন নেতা-কর্মী। চট্টগ্রাম গণহত্যা নামে পরিচিত এই ঘটনায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা।

চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার ঘাটে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে ১০ ট্রাক অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটকের ঘটনা ছিল অনেকটা আকস্মিক। আওয়ামীলীগকে নিশ্চিহ্ন করার অংশ হিসেবে উলফা নেতার এসব অস্ত্র আনার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচিত হয়। ওই বছরের ২১ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন, আহত হন কয়েকশ। অল্পের জন্যে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ট্রাকের ওপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁকে ঘিরে ছিলেন দলীয় নেতারা। সেই মানববর্মই বাঁচিয়ে দেয় শেখ হাসিনাকে। এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট সরকার সাজায় জজ মিয়া নাটক। কিন্তু পরে এ নাটকও রণে ভঙ্গ দেয়।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলার একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) জানান দিয়েছিল, ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের বিপদ পিছু ছাড়েনি। রাজাকারের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়ে, রাজাকারদের সংসদে নিয়ে গিয়ে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের অমর্যাদা করে অপশক্তি জানিয়েছিল, তারা হাল ছাড়বে না। এরপর দীর্ঘ প্রায় এক বছর কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনাকে অন্যায়ভাবে শেরেবাংলা নগরে সাব-জেলে বন্দি রাখার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্তি দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হলেও তাঁর আদর্শকে খুনিচক্র হত্যা করতে পারেনি। সেই আদর্শ বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে যখনই উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করেছে, তখনই এসেছে বাধা। দলের ভেতর ছদ্মবেশে ঢুকে স্বাধীনতাবিরোধীরা বিস্তার করেছে ষড়যন্ত্রের জাল। দল ও দলের বাইরে যখনই শেখ হাসিনা শুদ্ধি অভিযান চালানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, তখনই এ অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে দেশদ্রোহীরা।

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণ ঘটেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদন্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দমমিক ৯। ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ-যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস’ সরকারের রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের এটি একটি বড় অর্জন। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মতো সফলতা অর্জন, শিক্ষা সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার এবং জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, দেশের সবক’টি উপজেলাকে ইন্টারনেটের আওতায় আনা, সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুফল পাচ্ছে জনগণ।

বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। আবিষ্কার হয়েছে পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং। স্বল্প সুদে অভিবাসন ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক স্থাপন, তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায় থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু জনগণকে রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা হয়েছে। এ যাবৎকালে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বাগ্রে।

বিদ্যুৎখাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য শিল্পের। রপ্তানি পণ্যের তালিকায় যোগ হয়েছে জাহাজ, ওষুধ এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। বাংলাদেশের আইটি শিল্প বহির্বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছে। হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি বিস্তৃত করতে বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও দুঃস্থ মহিলা ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃকালীন ভাতাসহ ভাতার হার ও আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। মন্দার প্রকোপে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত ছিল বাংলাদেশ তখন বিভিন্ন উপয্ক্তু প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতি সহায়তার মাধ্যমে মন্দা মোকাবেলায় সক্ষম হয়েছে।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে শেখ হাসিনা জাতীয় রাজনীতির হাল ধরতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন, কারাবরণ করেছেন। এতসব সত্ত্বেও তিনি বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।

১৫ আগস্টের বর্বরতা ঘটেছিল মানুষের চোখের আড়ালে, রাতের অন্ধকারে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে। এর মাঝখানের সব ঘটনাও সেই দিবালোকেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষায় ‘ইনডেমনিটি অরডিন্যান্স’ জারি করেন, যা ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান আইন হিসেবে অনুমোদন দেন৷ এ ঘটনা জাতির ইতিহাসে কলংক হয়ে থাকবে চিরকাল। পাশাপাশি কোনও জনসভায় হামলা চালিয়ে একটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মূল নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা চালানোর কোনও নজির ইতিহাসে বিরল।

১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় এসেছিল ২১ আগস্ট। এটিও ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সেই অপচেষ্টা। যিনি বঙ্গবন্ধুর রক্তের ও আদর্শের উত্তরাধিকারী, একমাত্র তাঁর হাতেই নিরাপদ বাংলাদেশ-দেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাতা আর শেখ হাসিনা হলেন আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যে রূপকল্প হাতে নিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে এখনই সময় খুনি মোশতাকের প্রেতাত্মাদের চিহ্নিত করা।