ষ্টাফ রিপোর্টার।।ক্যাপিটালমার্কেট২৪.কম

আগস্ট ১৬, ২০১৮

শহড়ে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা

সম্প্রতি ধামরাইয়ের আলাউদ্দিন পার্কের স্টাফ রুহুল আমিন (৪০) সিটি পরিবহনে মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তান যাচ্ছিলেন পার্কের জিনিসপত্রের জন্য। সঙ্গে ছিল ৭০ হাজার টাকা। বাসে বসে হকার কাছ থেকে একটা চিপস কিনে খেয়েছিল তিনি। সেটাই কাল হয় তার জন্য। পকেটে থাকা টাকা ও সঙ্গের মোবাইল ফোন খোয়ান তিনি। পরে শাহবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করে এক পথচারী তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভর্তি করান।

একই দিন যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গাবতলীগামী ৮ নম্বর বাস থেকে অবচেতন অবস্থায় সিদ্দীক আলী (৭৪) নামে এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে ওই বাসেরই আরেক যাত্রী। তিনি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার একটি পলিটেকনিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। ঢাকা থেকে পেনশনের টাকা নিয়ে এলাকায় যাওয়ার সময় অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারান তিনিও।পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই দিন পশ্চিম জুরাইন এলাকা থেকে আরিফুল নামে (২৮) একজনকে উদ্ধার করেন কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম। তারও পকেট কাটা ছিল। অর্থাৎ সর্বস্ব খুইয়েছেন তিনিও।

গত ৭ আগস্টের এই তিন ঘটনাসহ ৭ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়েছেন প্রায় ২৫ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বরাবরের মতোই ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তৎপর হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীদের বিশেষ গ্রুপ অজ্ঞান পার্টি। তাদের দৌরাত্ম্যে সহজ-সরল মানুষেরা উপার্জিত অর্থ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলেও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। অনেককেই মারাত্মক আহত হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে হাসপাতালের বেডে।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব চক্র সুসসংগঠিত হওয়ায় অধিকাংশ সময়ই তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে প্রতিনিয়তই এসব চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু এসব চক্রে হাজার হাজার সদস্য জড়িত থাকায় কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। তাই এসব অপরাধ ঠেকাতে সবার সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর গুলিস্তান, সদরঘাট, গাবতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ ও মহাখালীর মতো রাজধানীতে প্রবেশ ও রাজধানী থেকে বের হওয়ার পয়েন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। বিশেষ করে ঈদ বা উৎসবের মুখে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এ সময় খেটে খাওয়া মানুষরা উপার্জিত অর্থ নিয়ে গ্রামে ফেরেন স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে বেদনার ভাগিদার হতে হয় তাদের।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, চক্রের সদস্যদের টার্গেটে থাকে শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির সাধারণ মানুষ। কারণ তাদের সচেতনতার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি চক্রের সদস্যদের প্রতিহত করার সক্ষমতাও তাদের কম। কখনও কখনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতার সহযোগিতায় চক্রের দুয়েকজন সদস্য আটক হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাদের আটকে রাখা যায় না। আবার ঈদ বা উৎসব শেষে চক্রের সদস্যরা শহর ছেড়ে গ্রাম ও উপশহরগুলোতে আশ্রয় নেয়। ফলে তাদের ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এসব চক্রের সদস্যদের তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে। যদিও একেবারেই নির্মূল হয়নি।

অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বলছেন, তারা বাস, ট্রেন ও লঞ্চ ও সেগুলোর টার্মিনালের আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেন। অবস্থান বুঝে প্রতিটি চক্রে ২০ থেকে ২৫ জন, কখনও কখনও আরও বেশি সদস্য উপস্থিত থাকেন। এরপর পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে ২ থেকে ৫ মিনিটে যাত্রীদের অবচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেন তারা। কখনও কখনও যাত্রীদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতেও দীর্ঘসময় ব্যয় করতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনাতেই সাফল্য মেলে বলে জানান তারা।

চকবাজার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অজ্ঞান পার্টির একজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি সারাবাংলা’কে বলেন, ‘চুরি-ছিনতাইয়ের চেয়ে অজ্ঞান করে সবকিছু নিয়ে যাওয়া সহজ, ঝামেলাও কম। কারণ এই কাজ নিরবে করা যায়।’

অজ্ঞান পার্টির কাজের ধরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হকার সেজে চিপস, আচার, জুসসহ বিভিন্ন জাতের খাবার বিক্রির সময় যাত্রীর অবস্থা বুঝে চেতনাশক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। টার্গেটের কাছে এগুলো বিক্রি হয়ে গেলে হকারের কাজ শেষ। তার গ্রুপের অন্য সদস্যরা তখন যাত্রীকে অনুসরণ করতে বাসে ওঠে। তারপর ওই যাত্রী অজ্ঞান হলেই সবকিছু নিয়ে বাস থেকে নেমে যায় তারা। সদস্য সংখ্যা বেশি থাকায় সাধারণ যাত্রীরা আমাদের উপস্থিতি বুঝতেই পারেন না।’ বিভিন্ন ধরনের চেতনাশক ওষুধ ও মলম ব্যবহার করা হয় বলে জানান তিনি। তবে তার দাবি, তিনি আগে এসব চক্রের সঙ্গে কাজ করলেও এখন এসব ছেড়ে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ঈদকে ঘিরে অজ্ঞান পার্টিসহ অন্য যেকোনো পার্টি যেন তৎপর হতে না পারে সেজন্য পুলিশ সর্বদা কড়া নজরদারি করছে। সেই সঙ্গে নিয়মিত অভিযানও পারিচালিত হচ্ছে।’

তবে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি ঈদে ঘরমুখো মানুষকে খুব বেশি সচেতনতায় চলাচল করতে অনুরোধ জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘পুলিশ তো সবসময় এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তবে জনগণ সচেতন না হলে এ ধরনের চক্রকে একেবারে নির্মূল করা খুব কঠিন।’