সোহেল সানি

এপ্রিল ১২, ২০১৮

বাংলা নববর্ষ ও সনের জনক সম্রাট আকবর

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের জনক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি।সেসব অহেতুক প্রশ্নবাণে জর্জরিত না করে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ও বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার দৃষ্টিপটে মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক।
বাংলা সন বাংলাদেশের নিজস্ব সন। এর উৎপত্তি ও বিকাশের ইসলামী উত্তরাধিকার সঞ্চাত। এ সনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালীর ঐতিহ্যগত অনুভব। বাংলা সন বাংলার ঐতিহ্য পরস্পরায় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এলে পহেলা বৈশাখে বাঙালিরা আনন্দঘন উল্লাসে বিমোহিত হয়ে পড়ে। সারা বছরই যেন ধরে রাখার মধ্যে আমাদের বাঙালির স্বকীয়তার তাৎপর্য নিহীত রয়ে যায়। বঙ্গাব্দ, বাংলা সন বাংলা বর্ষপঞ্জী হলো বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্যমন্ডিত সৌর পঞ্জিকাভিত্তিক বর্ষপঞ্জী।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌদদিনের গণনা শুরু। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘন্টা লাগে। এই সময়টাই সৌরবছর।
গ্রেগরীয় সনের মতো বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাড়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আকাশের রাশিমন্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।
বাংলাদেশ ছাড়াও পূর্ব ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এই বর্যপঞ্জী ব্যবহৃত হয়। বঙ্গাব্দ শুরু হয় পহেলা বৈশাখ দিয়ে। বঙ্গাব্দ সব সময়েই গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর অপেক্ষা ৫৯৩ বছর কম। সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। সেই অনুযায়ী আজকের তারিখ ৩০ চৈত্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সনে বাংলা পঞ্জিকার প্রশ্নে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেতৃত্বাধীন কমিটির রেখে যাওয়া সুপারিশ গ্রহণ করেছে। তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন হিসাবে ধার্য করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে চৈত্র মাসে একদিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ভারত সাম্রাজ্যের সম্রাট আকবরের আদেশে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাঁরই বিজ্ঞ রাজ জ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ শিরাজীর গবেষণার ঐতিহাসিক ফসল বাংলা সনের উৎপত্তি ঘটে।
ব্রিটিশ রাজত্বের আগে এ দেশেও হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। সামাজিক ক্ষেত্র বিশেষ করে মওসুমের প্রতি দৃষ্টিপাত করেই রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরী সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌরসনের প্রয়োজনবোধ করে বাংলা সন বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঘটানো হয়। মানুষ কাল বা সময় বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছিল, সভ্যতার বিকাশের আদি যুগ থেকেই। প্রয়োজনের তাগিদে বছর, মাস, সপ্তাহ দিন ইত্যাদি গণনার প্রচলন করে। বাংলায় শকাব্দ, লক্ষনাব্দ,পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি সনের প্রচলন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় বাংলা বা বঙ্গাব্দের প্রচলন শুরু হলে। এই সন প্রচলনের ইতিহাসে সংযোগ ঘটেছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ। ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ জয়ের পর মুসলমান শাসনামলে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষনাব্দ সনের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরী সনের প্রচলন শুরু হয়।
সন শব্দটি আরবী শব্দ হতে উদ্ভূত, অর্থ বর্ষ। আর সাল কথাটা ফার্সি শব্দ হতে। বাংলা সনের জনক নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ভারত সম্রাট আকবরের পাশাপাশি রাজা শশাঙ্ক, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর নামও কোন কোন লেখক উল্লেখ করেছেন তাঁদের মনগড়া যু্ক্িততর্ক উপস্থাপন করে। যদিও ঐতিহাসিকদের যুক্তিবলে প্রমাণিত যে, মহামতি আকবরই বাংলা সন প্রবর্তনকারী। এদেশে সবাই হিজরী সনই ব্যবহার করতো। ফলে ফসল কাটার খুব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো, কারণ আগের বছর যে তারিখে ফসল কাটতো, পরের বছর সে তারিখ ১১ দিন এগিয়ে যেতো। আকবর যে হিজরী সন ছিল তখন থেকেই এক সৌরসংবত প্রবর্তন করেন। এটিই হচ্ছে বঙ্গাব্দ। সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ (হিজরী ৯৬৩) এবং ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এই থেকে ঐতিহাসিকরা একমত হন যে, হিজরী থেকেই বঙ্গাব্দ চালু করা হয়। ৫২২ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ হিজরী সনের শুরু হযরত মোহাম্মদ নবী করিম (সঃ) এর সময় হতে হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রাঃ) খিলাফতকালে হিজরী সনের সৃষ্টি। এই সনের শুরু ১৬ জুলাই ৬২২অব্দ ধরা হলেও আসলে হিজরতের তারিখ রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার। ২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ অব্দ ধরা হলে আরব দেশের নিয়মানুযায়ী বছরের প্রথম মাস পহেলা মহরমের তারিখ হতে বছর ধরা হয়েছে। হিজরী সন ছিল চন্দ্রমাস। ঔই মাসই হিজরী সন ও তারিখের হেরফের হতো, অর্থাৎ সৌর বছরের হিসাবের দিন তারিখ মাসের গরমিল হতো প্রচুর। সে কারণেই ৯৬৩ হিজরী = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু করা হয়। এভাবে ৯৬০= হিজরী = ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ এর ১১ এপ্রিল, সম্রাট মহামতি আকবরের সিংহাসন আরোহনের ও পহেলা বৈশাখ, ৯৬০ বাংলা সন। এসব একদিকে নবী করিম (সঃ) এর হিজরতের (৬২২ খ্রিষ্টাব্দ) , বাংলা সনের শুরু ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে। এবং আকবর সিংহাসন বসার (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) স্মৃতিবহ এবং ইংরেজী সন থেকে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১১ দিন কম। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ দিলেই ইংরেজি সন মিলতে পারে। আকবর অবশ্য তাঁর রাজত্বের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই বাংলা সন চালু করেন। আকবর সিংহাসনে বসেন ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল। যদিও তাঁর সিংহাসনে বসার প্রকৃত দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি।
বাংলায় আদি হতে ঋতু বৈচিত্র্য অনুসারে বাংলা সন চালু করা হয়। রাজার অভিষেক শুরু রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যে সব পঞ্জিকার বছর গণনা শুরু করা হয়, সে সকল বছরের যে দিনেই রাজার অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে বছর শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়। ঋতু বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলা পঞ্জিকা বাঙালির জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা পঞ্জিকা মোঘল শাসনামলের বহু আগে থেকে হাজার বছরের পুরানো এক ঐতিহ্য। মোঘলরা বাংলায় খাজনা আদায়ের জন্য ১৫৮৬ খ্রিষ্টাব্দের হিজরী পঞ্জিকার বদলে বাংলা পঞ্জিকা গ্রহণ করে। আজকের বাংলা পঞ্জিকা প্রকারান্তরে শশাঙ্কব্দ যার শুরু ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে।

আকবর ছিলেন সকল ধর্মের
বঙ্গাব্দ বা বাংলা সালের ইতিবৃত্ত তুলে ধরার আগে চোখ ফেরাই সম্রাট আকবরের দিকে। আকবর সকলের প্রতি শান্তি নীতি (সুলহ-ই-কুল বা ঁহরাবৎংষ ঃড়ষবৎধঃরড়হ) প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি সকল ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন, কোন ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। উপরোক্ত নীতির আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি দীন -ই -এলাহী নামে নতুন ধর্মমত প্রচার করেন। আকবর রাজপুত বিয়ে করে এবং হিন্দুদের সংস্পর্শে এসে আরও উদার হয়ে ওঠেন। পরাজিত শত্রুদের দাস করার প্রথা রহিত করে পরাজিতদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের ওপর অত্যাচার করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। হিন্দুদের মন্দিরে বা মেলায় যাতায়াতের ওপর থেকে কর আদায় এমনকি জিজিরা করসহ হিন্দুদের সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে দেন। ১৫৭৯ খিষ্ট্রাব্দে ঘোষণা করেন ধর্মীয় কোন প্রশ্নে আলেমরা একমত হতে না পারলে সম্রাট সেসব প্রশ্নে চূড়ান্ত রায় দেবেন। এ জন্য আবুল ফজলের পিতা শয়খ মুবারকের নেতৃত্বে একটি ওলামা পরিষদও গঠন করে দেন। সম্রাট আকবর নিজেকে ইমাম -ই -আদিল (মুজতাহিদ) ঘোষণা করলে রক্ষনশীল আলেমরা বিক্ষুূদ্ধ হয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সৈন্যদের মাঝে। ১৫৮০ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্রোহ শুরু হয়। সুবাদার মুজফফর খানের নিহত হওয়া ও আবুল ফজল অনুগত বাহিনীর কাপুরুষতা ও নিষ্কিয়তাকে দায়ী করা হয়। বিদ্রোহীরা বাংলায় আকবরের ভাই মীর্যা হাকিমকে সম্রাট ঘোষণা করে তার নামে খুতবা পাঠ করে। ম্যীা হাকিম কাবুলের শাসক ছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে আকবর পুনুরুদ্ধার করেন শাসনকৃত রাজ্য সমুহ। আকরর ১৫৮২ সালের ৬ এপ্রিল মির্জা আজীজ কোকাকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করে খান আযম উপাধি দেন। ১৫৮৩ সালের ১৮ মে নতুন শাসক করা হয় শাহবাজ খানকে।